বাংলা ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সমাস। সমাস শব্দটির অর্থ হলো সংক্ষেপণ বা মিলন। বাক্যকে সংক্ষিপ্ত ও শ্রুতিমধুর করার জন্য সমাসের ব্যবহার অপরিহার্য। সমাসের মাধ্যমে একাধিক পদ এক পদে পরিণত হয়, যা ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
সমাস কী ও কেন?
সমাস হলো দুই বা ততোধিক পদের মিলন, যার মাধ্যমে একটি নতুন পদ তৈরি হয়। যেমন, ‘সিংহাসন’ শব্দটি ‘সিংহ চিহ্নিত আসন’ এই তিনটি পদের মিলনে গঠিত হয়েছে। এখানে ‘সিংহ’ ও ‘আসন’ পদ দুটি মিলিত হয়ে একটি নতুন পদ ‘সিংহাসন’ তৈরি করেছে। সমাসের উদ্দেশ্য হলো বাক্যকে সংক্ষিপ্ত করা এবং ভাষার মাধুর্য বৃদ্ধি করা।
সমাসের প্রয়োজনীয়তা:
ভাষাকে সংক্ষিপ্ত ও শ্রুতিমধুর করার জন্য সমাসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সমাসের মাধ্যমে জটিল বাক্যকে সহজে প্রকাশ করা যায়, যা ভাষার ব্যবহারকে সহজ করে। এছাড়া, সমাসের মাধ্যমে নতুন শব্দ তৈরি করা যায়, যা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে।
সমাসের বৈশিষ্ট্য:
- সমাসের মাধ্যমে দুই বা ততোধিক পদ এক পদে পরিণত হয়।
- সমাসের মাধ্যমে বাক্যকে সংক্ষিপ্ত করা যায়।
- সমাসের মাধ্যমে ভাষার মাধুর্য বৃদ্ধি পায়।
- সমাসের মাধ্যমে নতুন শব্দ তৈরি করা যায়।
সমাসের প্রকারভেদ
সমাস প্রধানত ছয় প্রকার। নিচে প্রতিটি প্রকারের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো:
দ্বন্দ্ব সমাস:
যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের প্রাধান্য থাকে, তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। এই সমাসে পূর্বপদ ও পরপদ উভয়ের অর্থ প্রধান থাকে। দ্বন্দ্ব সমাসের কিছু বৈশিষ্ট্য হলো:
- এই সমাসে দুই বা ততোধিক পদ মিলিত হয়ে একটি নতুন পদ গঠন করে।
- মিলিত পদগুলির প্রত্যেকটির অর্থ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
- সাধারণত “ও”, “এবং”, “আর” ইত্যাদি সংযোজক অব্যয় দ্বারা পদগুলি যুক্ত থাকে।
প্রকারভেদ:
দ্বন্দ্ব সমাসকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মিলনার্থক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে পদগুলি মিলিত হয়ে একটি মিলনের ভাব প্রকাশ করে, তাকে মিলনার্থক দ্বন্দ্ব বলে। মিলনার্থক দ্বন্দ্ব সমাসের কিছু উদাহরণ:
- ভাই ও বোন = ভাই-বোন
- মা ও বাবা = মা-বাবা
- চাল ও ডাল = চাল-ডাল।
২. বিরোধার্থক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে পদগুলি মিলিত হয়ে একটি বিরোধের ভাব প্রকাশ করে, তাকে বিরোধার্থক দ্বন্দ্ব বলে। বিরোধার্থক দ্বন্দ্ব সমাসের কিছু উদাহরণ:
- দা ও কুমড়া = দা-কুমড়া
- স্বর্গ ও নরক = স্বর্গ-নরক
- শত্রু ও মিত্র = শত্রু-মিত্র।
৩. বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে পদগুলি একে অপরের বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে, তাকে বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব বলে। বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব সমাসের কিছু উদাহরণ:
- আয় ও ব্যয় = আয়-ব্যয়
- ছোট ও বড় = ছোট-বড়
- দিন ও রাত = দিন-রাত।
৪. সংখ্যাবাচক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে সংখ্যাবাচক শব্দ ব্যবহৃত হয়, তাকে সংখ্যাবাচক দ্বন্দ্ব বলে। সংখ্যাবাচক দ্বন্দ্ব সমাসের কিছু উদাহরণ:
- সাত ও পাঁচ = সাত-পাঁচ
- নয় ও ছয় = নয়-ছয়
৫. সমার্থক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে পদগুলি একই অর্থ প্রকাশ করে, তাকে সমার্থক দ্বন্দ্ব বলে। সমার্থক দ্বন্দ্ব সমাসের কিছু উদাহরণ:
- হাট ও বাজার = হাট-বাজার
- ঘর ও বাড়ি = ঘর-বাড়ি
- পোশাক ও পরিচ্ছদ = পোশাক-পরিচ্ছদ।
৬. অলুক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে কোনো সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ পায় না, তাকে অলুক দ্বন্দ্ব বলে। অলুক দ্বন্দ্ব সমাসের কিছু উদাহরণ:
- দুধে ও ভাতে = দুধে-ভাতে
- জলে ও স্থলে = জলে-স্থলে
- দেশে ও বিদেশে = দেশে-বিদেশে।
৭. বহুপদী দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে দুইয়ের বেশি পদ মিলিত হয়, তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব বলে। বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাসের কিছু উদাহরণ:
- রূপ, রস, গন্ধ ও স্পর্শ = রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ
- সাহেব, বিবি ও গোলাম = সাহেব-বিবি-গোলাম
- নাক, কান ও গলা = নাক-কান-গলা।
৮. একশেষ দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে অনেকগুলো পদের মধ্যে শেষ পদটি বজায় থাকে, তাকে একশেষ দ্বন্দ্ব বলে। বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাসের উদাহরণ:
- সে, তুমি ও আমি = আমরা
দ্বিগু সমাস:
সমাহার বা সমষ্টি অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে। এই সমাসে পূর্বপদ সংখ্যাবাচক ও পরপদ বিশেষ্য হয়। দ্বিগু সমাসের বৈশিষ্ট্যগুলো হল:
- এই সমাসে পূর্বপদ সংখ্যাবাচক শব্দ হয়।
- পরপদ বিশেষ্য পদ হয়।
- সমাসবদ্ধ পদটি সাধারণত সমষ্টি বা সমাহার বোঝায়।
প্রকারভেদ:
ব্যাকরণবিদদের মধ্যে দ্বিগু সমাসের প্রকারভেদ নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তবে, গঠন ও অর্থের দিক থেকে দ্বিগু সমাসকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
১. সমাহার দ্বিগু: যে দ্বিগু সমাসে সংখ্যাবাচক শব্দ ও বিশেষ্য পদের মিলনে একটি সমষ্টি বা সমাহার বোঝায়, তাকে সমাহার দ্বিগু বলে। নিচে সমাহার দ্বিগুর কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:
- তিন কালের সমাহার = ত্রিকাল
- পঞ্চবটের সমাহার = পঞ্চবটী
- সপ্ত ঋষির সমাহার= সপ্তর্ষি
- তিন মাথার সমাহার = তেমাথা
- শত অব্দের সমাহার = শতাব্দী
২. তদ্ধিতার্থ দ্বিগু: যে দ্বিগু সমাসে সংখ্যাবাচক শব্দ ও বিশেষ্য পদের মিলনে তদ্ধিত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠিত হয়, তাকে তদ্ধিতার্থ দ্বিগু বলে। নিচে তদ্ধিতার্থ দ্বিগুর কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:
- পঞ্চ গো দ্বারা ক্রীত = পঞ্চগু
- শত অব্দে জাত = শতাব্দিক
অনেক ব্যাকরণবিদ দ্বিগু সমাসকে কর্মধারয় সমাসের অন্তর্ভুক্ত করেন। কারণ, দ্বিগু সমাসেও পরপদের অর্থ প্রধান থাকে। দ্বিগু সমাসে সমাসনিষ্পন্ন পদটি সাধারণত বিশেষ্য পদ হয়। নিচে দ্বিগু সমাসের আরো কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:
- তেপায়া (তিন পায়ের সমাহার)
- চৌরাস্তা (চার রাস্তার সমাহার)
- নবরত্ন (নয় রত্নের সমাহার)
- ত্রিভুজ (তিন বাহুর সমাহার)
- সপ্তাহ (সাত দিনের সমাহার)
- পঞ্চনদ (পাঁচ নদীর সমাহার)
কর্মধারয় সমাস:
যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থই প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয়, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। কর্মধারয় সমাসের কিছু বৈশিষ্ট্য হলো:
- এই সমাসে বিশেষণ ও বিশেষ্যের মধ্যে সমাস হয়।
- পরপদের অর্থ প্রধান থাকে।
- ব্যাসবাক্যে সাধারণত ‘যে’, ‘যিনি’, ‘যে সে’, ‘যিনি তিনি’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয়।
প্রকারভেদ:
কর্মধারয় সমাসকে প্রধানত পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়: নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সাধারণ কর্মধারয়: যেখানে বিশেষণ ও বিশেষ্য পদের মধ্যে সাধারণ সম্পর্ক থাকে, তাকে সাধারণ কর্মধারয় বলে। নিচে সাধারণ কর্মধারয়ের কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:
- নীল যে পদ্ম = নীলপদ্ম
- কাঁচা অথচ মিষ্টি = কাঁচামিঠা
- শান্ত অথচ শিষ্ট = শান্তশিষ্ট
- যিনি রাজা তিনি ঋষি = রাজর্ষি
২. মধ্যপদলোপী কর্মধারয়: যে কর্মধারয় সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদের লোপ হয়, তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় বলে। নিচে মধ্যপদলোপী কর্মধারয়ের কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:
- সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন
- সাহিত্য বিষয়ক সভা = সাহিত্যসভা
- স্মৃতি রক্ষার্থে সৌধ = স্মৃতিসৌধ
- ব্রাহ্মণ ধর্মীয় প্রধান পুরোহিত = ব্রাহ্মণ পুরোহিত
- জগতের রক্ষাকারী ঈশ্বর = জগদীশ্বর
৩. উপমান কর্মধারয়: যেখানে উপমেয় পদের সাথে উপমান পদের তুলনা করা হয়, তাকে উপমান কর্মধারয় বলে। এই সমাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সাধারণ গুণের উল্লেখ থাকে। নিচে উপমান কর্মধারয়ের কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:
- তুষারের ন্যায় শুভ্র = তুষারশুভ্র
- ভ্রমরের ন্যায় কৃষ্ণ কেশ = ভ্রমরকৃষ্ণকেশ
- চন্দ্রের ন্যায় মুখ = চন্দ্রমুখ
- ক্রোধ রূপ অনল = ক্রোধানল
৪.উপমিত কর্মধারয় সমাস: সাধারণ গুণের উল্লেখ না করে উপমেয় পদের সাথে উপমান পদের যে সমাস হয়, তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। উপমিত কর্মধারয় সমাসের বৈশিষ্ট্য হলো:
- এই সমাসে সাধারণ গুণের উল্লেখ থাকে না।
- উপমেয় পদটি আগে বসে এবং উপমান পদটি পরে বসে।
- ব্যাসবাক্যে ‘ন্যায়’ বা ‘মতো’ শব্দ ব্যবহৃত হয়।
নিচে উপমিত কর্মধারয়ের কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:
- পুরুষ সিংহের ন্যায় = পুরুষসিংহ
- মুখ চন্দ্রের ন্যায় = চন্দ্রমুখ
- ফুল কুমারীর ন্যায় = ফুলকুমারী
- পাদ পদ্মের ন্যায় = পাদপদ্ম
- কর কমলের ন্যায় = করকমল
উপমান কর্মধারয় সমাস এবং উপমিত কর্মধারয় সমাসের মধ্যে পার্থক্য: উপমান কর্মধারয় সমাসে সাধারণ গুণের উল্লেখ থাকে, কিন্তু উপমিত কর্মধারয় সমাসে সাধারণ গুণের উল্লেখ থাকে না। যেমন- উপমান কর্মধারয়: তুষারের ন্যায় শুভ্র = তুষারশুভ্র (এখানে ‘শুভ্র’ সাধারণ গুণ) । উপমিত কর্মধারয়: মুখ চন্দ্রের ন্যায় = চন্দ্রমুখ (এখানে কোনো সাধারণ গুণের উল্লেখ নেই) ।
৫. রূপক কর্মধারয়: যেখানে উপমেয় পদের সাথে উপমান পদের অভেদ কল্পনা করা হয়, তাকে রূপক কর্মধারয় বলে। এই সমাসে উপমেয় ও উপমানের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। নিচে উপমান কর্মধারয়ের কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:
- বিদ্যা রূপ রত্ন = বিদ্যারত্ন
- বিষাদ রূপ সিন্ধু = বিষাদসিন্ধু
- সংসার রূপ সাগর = সংসারসাগর
- মন রূপ মাঝি = মনমাঝি
- জীবন রূপ প্রদীপ = জীবনপ্রদীপ
কর্মধারয় সমাসে বিশেষণ ও বিশেষ্য পদের মধ্যে বিভিন্ন সম্পর্ক থাকতে পারে, যেমন: গুণবাচক, অবস্থাবাচক, তুলনাবাচক ইত্যাদি। কর্মধারয় সমাসে সমাসনিষ্পন্ন পদটি সাধারণত বিশেষ্য পদ হয়।
তৎপুরুষ সমাস:
পূর্বপদের বিভক্তির লোপে যে সমাস হয় এবং যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রধানভাবে বোঝায়, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। তৎপুরুষ সমাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল:
- এই সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায়।
- পরপদের অর্থ প্রধান থাকে।
প্রকারভেদ:
তৎপুরুষ সমাসকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ: যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে) লোপ পায়, তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ বলে। দ্বিতীয়া তৎপুরষের কিছু উদাহরণ হলো:
- রথকে দেখা = রথদেখা
- বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন
- চিঠিকে প্রাপ্ত = চিঠিপাপ্ত।
২. তৃতীয়া তৎপুরুষ: যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের তৃতীয়া বিভক্তি (দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক) লোপ পায়, তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ বলে। তৃতীয়া তৎপুরষের কিছু উদাহরণ হলো:
- মন দিয়ে গড়া = মনগড়া
- শ্রম দ্বারা লব্ধ = শ্রমলব্ধ
- ধনী কর্তৃক পোষিত = ধনীপোষিত।
৩. চতুর্থী তৎপুরুষ: যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের চতুর্থী বিভক্তি (জন্য, নিমিত্ত) লোপ পায়, তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ বলে। চতুর্থী তৎপুরষের কিছু উদাহরণ হলো:
- বিয়ের জন্য নিমন্ত্রণ = বিয়ে নিমন্ত্রণ।
- ছাত্রদের জন্য আবাস = ছাত্রাবাস
- তীর্থের জন্য যাত্রা = তীর্থযাত্রা।
৪. পঞ্চমী তৎপুরুষ: যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে, চেয়ে) লোপ পায়, তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ বলে। পঞ্চমী তৎপুরষের কিছু উদাহরণ হলো:
- দেশ থেকে পলাতক = দেশপলাতক
- জেল থেকে খালাস = জেলখালাস
- গাছ থেকে পড়া = গাছপড়া।
৫. ষষ্ঠী তৎপুরুষ: যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের ষষ্ঠী বিভক্তি (র, এর) লোপ পায়, তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ বলে। পঞ্চমী তৎপুরষের কিছু উদাহরণ হলো:
- চায়ের বাগান = চাবাগান
- রাজার পুত্র = রাজপুত্র
- দেবতার আলয় = দেবালয়।
৬. সপ্তমী তৎপুরুষ: যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের সপ্তমী বিভক্তি (এ, য়, তে) লোপ পায়, তাকে সপ্তমী তৎপুরুষ বলে। সপ্তমী তৎপুরষের কিছু উদাহরণ হলো:
- গাছে পাকা = গাছপাকা
- দিবাতে নিদ্রা = দিবানিদ্রা
- বাক্যে পটু = বাকপটু।
৭. নঞ্ তৎপুরুষ: নঞ্ অব্যয় (না, নেই, নয়) যোগে যে তৎপুরুষ সমাস হয়, তাকে নঞ্ তৎপুরুষ সমাস বলে। নঞ্ তৎপুরষের কিছু উদাহরণ হলো:
- ন লৌকিক = অলৌকিক
- ন কাতর = অকাতর
- ন কাল = অকাল।
৮. উপপদ তৎপুরুষ: কৃদন্ত পদের সঙ্গে উপপদের যে সমাস হয়, তাকে উপপদ তৎপুরুষ সমাস বলে। উপপদ তৎপুরষের কিছু উদাহরণ হলো:
- জল দেয় যে = জলদ
- পকেট মারে যে = পকেটমার
- জলে চরে যা = জলচর
তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পাওয়ার কারণে পরপদের অর্থ প্রধান হয়ে ওঠে।
অব্যয়ীভাব সমাস:
পূর্বপদে অব্যয়যোগে নিষ্পন্ন সমাসে যদি অব্যয়ের অর্থই প্রধান হয়, তবে তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। এই সমাসে পূর্বপদের অব্যয়ের অর্থ প্রধান থাকে। সমাসবদ্ধ পদটি সাধারণত ক্রিয়াবিশেষণ বা অব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অব্যয়ীভাব সমাসের কিছু উদাহরণ হলো:
- জন্ম পর্যন্ত = আজন্ম
- কূলের সমীপে = উপকূল
- মরণ পর্যন্ত = আমরণ
- দিন দিন = প্রতিদিন
- অভাব নেই = অভাব
অব্যয়ীভাব সমাস বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। নিচে কয়েকটি প্রধান অর্থ ও উদাহরণ দেওয়া হলো:
১. সামীপ্য (নিকটতা):
- কূলের সমীপে = উপকূল
- নগরীর সমীপে = উপনগরী
২. বিপ্সা (পুনঃ পুনঃ):
- দিন দিন = প্রতিদিন
- ক্ষণে ক্ষণে = প্রতিক্ষণ
৩. পর্যন্ত:
- জন্ম পর্যন্ত = আজন্ম
- মরণ পর্যন্ত = আমরণ
৪. অভাব:
- অভাব নেই = অভাব
- আমিষের অভাব = নিরামিষ
৫. অনতিক্রম্যতা:
- বিধিকে অতিক্রম না করে = যথাবিধি
- সাধ্যকে অতিক্রম না করে = যথাসাধ্য
৬. সাদৃশ্য:
- আকৃতির সদৃশ = প্রতিমূর্তি
৭. পশ্চাৎ:
- অনুতে গমন = অনুগমন
বহুব্রীহি সমাস:
যে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনোটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্য কোনো পদকে বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। বহুব্রীহি সমাসের বৈশিষ্ট্য হল:
- এই সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনোটির অর্থ প্রধান থাকে না।
- সমাসবদ্ধ পদটি অন্য কোনো পদকে বোঝায়।
- সাধারণত ‘যার’, ‘যাতে’, ‘যাহার’, ‘যাহাতে’ ইত্যাদি শব্দ ব্যাসবাক্যরূপে ব্যবহৃত হয়।
প্রকারভেদ:
বহুব্রীহি সমাসকে প্রধানত আট ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সমানাধিকরণ বহুব্রীহি: পূর্বপদ বিশেষণ ও পরপদ বিশেষ্য হলে তাকে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি বলে। সমানাধিকরণ বহুব্রীহির কিছু উদাহরণ হলো:
- হত হয়েছে শ্রী যার = হতশ্রী
- খোশ মেজাজ যার = খোশমেজাজ
- নীল বসন যার = নীলবসন
২. ব্যধিকরণ বহুব্রীহি: পূর্বপদ ও পরপদ কোনোটিই বিশেষণ না হলে তাকে ব্যধিকরণ বহুব্রীহি বলে। ব্যধিকরণ বহুব্রীহির কিছু উদাহরণ হলো:
- আশীতে বিষ যার = আশীবিষ
- কথা সর্বস্ব যার = কথাসর্বস্ব
- বোঁটা খসেছে যার = বোঁটাখসা
৩. নঞ বহুব্রীহি: নঞ্ অব্যয় (না, নেই, নয়) যোগে যে বহুব্রীহি সমাস হয়, তাকে নঞ বহুব্রীহি বলে। নঞ বহুব্রীহির কিছু উদাহরণ হলো:
- নেই জ্ঞান যার = অজ্ঞান
- নেই আদি যার = অনাদি
- বে নেই তার = বেতার
৪. মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি: যে বহুব্রীহি সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদের লোপ হয়, তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি বলে। মধ্যপদলোপী বহুব্রীহির কিছু উদাহরণ হলো:
- হাতে খড়ি দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = হাতেখড়ি
- গায়ে হলুদ দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = গায়েহলুদ
- বিড়াল অক্ষি যার = বিড়লাক্ষি
৫. সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি:পূর্বপদে সংখ্যাবাচক শব্দ থাকলে তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি বলে। সংখ্যাবাচক বহুব্রীহির কিছু উদাহরণ হলো:
- দশ আনন যার = দশানন
- চার মাথা যার = চৌমাথা
- তিন চোখ যার = তেচোখা
৬. অলুক বহুব্রীহি: যে বহুব্রীহি সমাসে কোনো সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ পায় না, তাকে অলুক বহুব্রীহি বলে। অলুক বহুব্রীহির কিছু উদাহরণ হলো:
- গায়ে হলুদ যার = গায়েহলুদ
- মাথায় পাগড়ি যার = মাথায়পাগড়ি
- হাতে ছড়ি যার = হাতেছড়ি
৭. প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি: যে বহুব্রীহি সমাসের শেষে ‘আ’, ‘এ’, ‘ও’ ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত হয়, তাকে প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি বলে। প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহির কিছু উদাহরণ হলো:
- এক চোখা যার = একচোখা
- দুই কান কাটা যার = দুকানকাটা
- ঘর মুখা যার = ঘরমুখো
৮. সহ বা সহার্থক বহুব্রীহি: ‘সহ’ বা ‘সমান’ শব্দের সঙ্গে অন্য পদের বহুব্রীহি সমাস হলে তাকে সহার্থক বহুব্রীহি বলে। সহার্থক বহুব্রীহির কিছু উদাহরণ হলো:
- সস্ত্রীক (স্ত্রীর সহিত বর্তমান)
- সবান্ধব (বন্ধুর সহিত বর্তমান)
- সমান কর্মী যে = সহকর্মী
সমাস বাংলা ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ভাষাকে সংক্ষিপ্ত ও শ্রুতিমধুর করে। সমাসের প্রকারভেদ ও নিয়মাবলী ভালোভাবে জানা থাকলে বাংলা ভাষার ব্যবহার আরও সহজ ও সুন্দর হয়।














